بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
৭৪
সূরা মুদ্দাছ্ছির
নাযিলের ধরন:
মক্কী
আয়াত সংখ্যা:
৫৬ টি
সূরা নম্বর:
৭৪
পড়া হয়েছে:
৬৪৫০ বার
আয়াত ও তাফসীর
সূরা মুদ্দাছ্ছির বা বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত -৭৪
৫৬ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এই সূরাটি পূর্বোক্ত সূরার সমসাময়িক। বিষয়বস্তুও প্রায় একই। প্রার্থনা এবং আল্লাহ্র প্রশংসা করা, বিপদ বিপযর্য়ের সময়ে যখন আধ্যাত্মিক জগত চাপের মুখে থাকে তখন ধৈর্য্য ধারণের প্রয়োজনীয়তা। যারা অন্যায়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে দুঃখ ও দুর্দ্দশার সৃষ্টি করেছে, তারা পরলোকে নিদারুণ যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা লাভ করবে।
সূরা মুদ্দাছ্ছির বা বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত -৭৪
৫৬ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। ওহে [ পোষাকে ] আবৃত মানুষ ৫৭৭৮।
৫৭৭৮। অবতীর্ণ সূরাগুলির মধ্যে এই সূরাটি প্রাথমিক। প্রাথমিক সূরার এই আয়াতে দুটি চিন্তার ধারা পাশাপাশি বিরাজ করছে।
১) প্রথমতঃ আয়াতটির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভাবে রাসুলকে (সা) সম্বোধন করা হয়েছে।
২) বিশ্বের সকল যুগের সকল মানুষের জন্য আছে আধ্যাত্মিক উপদেশ।
প্রথমত : ১) যে সময়ে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়,তখন রাসুল নবুয়ত লাভ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত ধ্যানমগ্ন অবস্থা যা বস্ত্রাচ্ছিদ অবস্থার সাথে তুলনীয়। যে অবস্থায় তিনি সর্ব অবস্থায় থাকতেন বা আল্লাহকে খুজঁতেন তা কেটে গেছে। তাকে আদেশ করা হয়েছে যে তিনি নির্ভিক ভাবে প্রকাশ্যে আল্লাহ্র বাণী প্রচারে অগ্রসর হবেন। যদিও তিনি সর্বদাই ছিলেন পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত পবিত্রতাই নয়, তাঁর সকল কাজ নিবেদিত হতে হবে সমাজে শুধুমাত্র আল্লাহর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার জন্য। পূর্বপুরুষদের সকল জঘন্য প্রথা এবং দেবদেবীর উপাসনা অবশ্যই বিদূরিত করতে হবে। আল্লাহ্র নবী সারা বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ যা তাঁর ব্যক্তিত্ব থেকে প্রবাহিত। এর জন্য তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট থেকে কোনও পুরষ্কার বা প্রশংসা দাবী করেন না। বরং ঘটনা ছিলো এর উল্টো। তার উপরে অত্যাচার ও নির্যাতনের ঝড় বয়ে যায়। সে সময়ে তাঁকে ধৈর্য্য ধারণ করতে বলা হয় আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য।
২) দ্বিতীয়তঃ সাধারণ পর্যায়ে বিপদ বিপর্যয়ের মাধ্যমে এরূপ অবস্থা আসতে পারে, সেক্ষেত্রে নবী করিমের জীবনী ও কর্ম ক্ষেত্র আমাদের জন্য হবে পথের দিশারী।
২। ওঠ, এবং সতর্ক কর,
৩। এবং তোমার প্রভুকে মহিমান্বিত কর !
৪। এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ, ৫৭৭৯
৩। এবং তোমার প্রভুকে মহিমান্বিত কর !
৪। এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ, ৫৭৭৯
৫৭৭৯। সম্ভবতঃ এই আয়াতটি তাৎক্ষণিক কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে। রাসুলকে (সা) অত্যাচার ও নির্যাতন করার জন্য মোশরেক আরবেরা তার শরীর ও পোষাকে ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করতো।
৫। সকল অনাচার পরিত্যাগ কর। ৫৭৮০
৫৭৮০। 'Rujz' বা 'Rijz'অর্থ অপবিত্রতা। সাধারণ ভাবে পৌত্তলিকতাকে বুঝানো হয়েছে। 'Rujz' নামে মোশরেক আরবদের কোন দেবতা থাকাও সম্ভব হতে পারে।
৬। [ বিনিময়ে ] অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো না ৫৭৮১
৫৭৮১। সাধারণতঃ আমরা কাউকে কিছু দেই বিনিময়ে কিছু লাভ করার জন্য। সংসারে দেয়া নেয়ার বাণিজ্য সর্বকালের। সাধারণভাবে আমরা যা দেই তার থেকে অধিক এবং আমাদের কাছে যা মূল্যবান বলে প্রতীয়মান হয় তাই লাভে আগ্রহী হই। এ হচ্ছে পার্থিব জীবনের বাণিজ্য ও তার হিসাব। কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবনের বাণিজ্যের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা। যারা আত্মিক গুণে সমৃদ্ধ তারা দেবেন কিন্তু বিনিময়ে কিছু দাবী বা আশা করেন না। তারা আল্লাহ্র সৃষ্টির সেবা করেন শুধুমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের আশায়।
৭। বরং আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে ধৈর্য্য ধারণ কর এবং দৃঢ় থাক। ৫৭৮২
৫৭৮২। যদিও উপদেশটি রাসুলের জন্য ছিলো তবে তার আবেদন সর্বকালের সর্বযুগের, সর্বসাধারণের জন্য। আল্লাহ্র রাস্তায়, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করা অত্যন্ত দূরূহ ব্যাপার। বাধা বিপত্তি, অসম্মান, নির্যাতন, যে কোন সৎকাজকে বাধা দানে বিপর্যস্ত করে ফেলে। সে ক্ষেত্রেই আমাদের প্রদর্শন করতে হবে চরিত্রের দৃঢ়তা ও ধৈর্য্য এবং সৎকাজে বিশ্বস্তভাবে লেগে থাকার যোগ্যতা। যদি আমাদের প্রকৃত ঈমান থাকে এবং আমরা সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ্র উপরে নির্ভরশীল হই, তবে আমরা জানবো যে, আল্লাহ্ সকল কল্যাণের মালিক, সর্বোচ্চ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী, সর্বশক্তিমান। সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে সকল সৎ কাজ সফলতা লাভ করবেই, আল্লাহ্র অনুগ্রহে।
৮। অবশেষে যখন, শিঙ্গা বাজানো হবে,
৯। সেদিন হবে এক কঠিন দিন, ৫৭৮৩
১০। যারা কাফের তাদের জন্য নিশ্চয় তা সহজ হবে না।
৯। সেদিন হবে এক কঠিন দিন, ৫৭৮৩
১০। যারা কাফের তাদের জন্য নিশ্চয় তা সহজ হবে না।
৫৭৮৩। আল্লাহ্র রহমত প্রত্যাশীদের বর্ণনা শেষে তারই পটভূমিতে তুলে ধরা হয়েছে পাপীদের অবস্থানকে। সাধারণতঃ পৃথিবীর ভোগ বিলাসের জীবনে পাপীরা থাকে আত্ম নিমগ্ন ও পরিতৃপ্ত। কিন্তু শেষ বিচারের দিনে তাদের অবস্থা কি হবে ? শেষের সে দিন হবে বড়ই ভয়ঙ্কর।
১১। যে [ প্রাণীকে ] আমি সৃষ্টি করেছি [ রিক্ত ] ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার সাথে আমাকে একা [ বুঝাপড়া ]করতে ছেড়ে দাও। ৫৭৮৪, ৫৭৮৫।
১২। যাকে আমি দান করেছিলাম বিপুল ধন-সম্পদ
১২। যাকে আমি দান করেছিলাম বিপুল ধন-সম্পদ
৫৭৮৪। প্রকৃত ন্যায় বিচারের মালিক একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ্। তিনিই একমাত্র পারেন মানুষকে শাস্তি দান করতে। পৃথিবীর মানুষের জ্ঞান ও বিচার বুদ্ধি অত্যন্ত সীমিত। তার পক্ষে সত্যের সূদূর প্রসারী রূপকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কারণ পৃথিবীর মূল্যবোধের মানদন্ডে আজকে যা মনে হয় ন্যায় ও সত্য আগামীতে তা পরিবতির্ত হয়ে যেতে পারে। একমাত্র আল্লাহ্-ই জানেন চিরসত্যের প্রকৃতরূপ। সুতারাং আল্লাহ্-ই একমাত্র জানেন ন্যায়বিচারের এবং করুণার সীমারেখা। সেই আল্লাহ্র কাছে সব কিছু ন্যাস্ত করতে হবে।
৫৭৮৫। " আমি সৃষ্টি করেছি [ রিক্ত ] ও নিঃস্ব অবস্থায় " এই বাক্যটির অর্থ হচ্ছে পৃথিবীতে সকল মানুষকে আল্লাহ্ সমভাবে সৃষ্টি করেন নাই। হাতের পাঁচটি আঙ্গুল যেরূপ সমান নয়, সেরূপ সকল মানুষের মানসিক দক্ষতা সমান নয়। পৃথিবীর সভ্যতাকে এক সুনির্দ্দিষ্ট পরিণতির দিকে পরিচালিত করার জন্য, আল্লাহ্ সকলকে সমান মানসিক দক্ষতা দান করেন নাই। সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি,প্রতিভা এগুলি সবই আল্লাহ্র দান। মানুষ ইচ্ছা করলেই এ সকলের অধিকারী হতে পারে না। মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে নিরাভরণ ও একা। আল্লাহ্-ই তাঁকে বিভিন্ন নেয়ামতে সজ্জিত করেছেন যার দায়িত্ব তাকে বহন করতে হবে।
১৩। [ সর্বদা ] পাশে থাকার জন্য পুত্রগণ ৫৭৮৬;
১৪। যার [ জীবনকে ] করেছিলাম মসৃণ এবং আরামদায়ক !
১৪। যার [ জীবনকে ] করেছিলাম মসৃণ এবং আরামদায়ক !
৫৭৮৬। পৃথিবীতে যারা সফল পুরুষ, সাধারণতঃ তাদের থাকে অঢেল সম্পদ, অগণিত অনুসারী, পরিবার,পরিজন বা পুত্র কন্যাগণ যারা সর্বদা তার চতুর্পার্শ্বে থেকে তাকে সংসার সমরাংগনে সাহায্য করতে প্রস্তুত। পৃথিবীতে তাদের জীবন হয় অত্যন্ত মসৃণ, রুচিশীল, পরিশীলিত এবং আরামদায়ক। কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, প্রতিটি সম্পদের দায়িত্ব বর্তমান, যে দায়িত্বের জবাবদিহিতা আল্লাহ্র নিকট প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
১৫। এরপরেও সে হয় লোভী এবং [ কামনা করে ] আমি তাকে আরও দেই ; ৫৭৮৭
৫৭৮৭। সাধারণতঃ মানুষ আল্লাহ্র দেয়া নেয়ামত স্বরূপ যে সব মানসিক দক্ষতা সমূহের অধিকারী হয়, সে সম্বন্ধে সে এতটাই কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব প্রকাশ করে যে, সে ভুলে যায় যে এ সব সে জন্মসূত্রে লাভ করেছে মহান আল্লাহ্র নিকট থেকে। পাপীদের ধারণা যে, এ সবের একচ্ছত্র মালিক একমাত্র সে। আল্লাহ্র অনুগ্রহকে সে সনাক্ত করতে অক্ষম হয়। ফলে সে সম্পদ ও অনুগ্রহের যে দায়িত্ব তা বহন করতে হয় অপারগ। তাঁর ধারণা জন্মে যে, তার প্রতি দেয়া আল্লাহ্র সকল অনুগ্রহের মালিক সে নিজে। সে যত এই অনুগ্রহ লাভ করে তত সে আরও পাওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়ে। লোভ তার সকল সত্ত্বাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে সে আল্লাহ্র নিদর্শন ও বিধান সমূহের প্রতি ইচ্ছাকৃত ভাবে বধির হয়ে পড়ে এবং আল্লাহ্র বিধানের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ ভাবেই সে তার নিজস্ব সর্বনাশের কারণ হয়।
১৬। না তা হবার নয়। কেননা নিশ্চয় সে আমার নিদর্শন সমূহের বিরোধী।
১৭। শীঘ্রই আমি তাকে পরিদর্শন করবো পর্ববতপ্রমাণ বিপর্যয় দ্বারা ৫৭৮৮
১৭। শীঘ্রই আমি তাকে পরিদর্শন করবো পর্ববতপ্রমাণ বিপর্যয় দ্বারা ৫৭৮৮
৫৭৮৮। 'Mount of calamities' বা পর্বত প্রমাণ দুর্যোগ বা বিপর্যয় " যে ভাবেই তা প্রকাশ করা হোক না কেন তার অন্তনির্হিত তাৎপর্য একই থাকে আর তা হচ্ছে পুঞ্জীভূত বিপর্যয় যা সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে সঞ্চিত হতে থাকে।
১৮। নিশ্চয় সে চিন্তা করেছিলো এবং ষড়যন্ত্র করেছিলো ; -
১৯। দুর্ভাগ্য তার ! কেমন করে সে [ ষড়যন্ত্র করার ] সিদ্ধান্ত করলো ! ৫৭৮৯
১৯। দুর্ভাগ্য তার ! কেমন করে সে [ ষড়যন্ত্র করার ] সিদ্ধান্ত করলো ! ৫৭৮৯
৫৭৮৯। দেখুন [ ৫১ : ১০ ] আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, " অনুমানকারীরা ধ্বংস হোক। " অর্থাৎ যারা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
২০। হ্যাঁ, দুর্ভাগ্য তার; কেমন করে সে [ ষড়যন্ত্রের ] সিদ্ধান্তে উপনীত হলো।
২১। অতঃপর সে চর্তুদ্দিকে তাকালো;
২২। অতঃপর সে ভ্রূকুঞ্চিত এবং মুখ বিকৃত করলো ;
২৩। অতঃপর সে পিছন ফিরলো এবং দম্ভ প্রকাশ করলো।
২৪। অতঃপর সে বলেছিলো, ৫৭৯০, " এটা তো প্রাচীনকাল হতে প্রাপ্ত যাদু ব্যতীত অন্য কিছু নয় ;
২৫। " এটা তো মরণশীল মানুষের কথা।"
২১। অতঃপর সে চর্তুদ্দিকে তাকালো;
২২। অতঃপর সে ভ্রূকুঞ্চিত এবং মুখ বিকৃত করলো ;
২৩। অতঃপর সে পিছন ফিরলো এবং দম্ভ প্রকাশ করলো।
২৪। অতঃপর সে বলেছিলো, ৫৭৯০, " এটা তো প্রাচীনকাল হতে প্রাপ্ত যাদু ব্যতীত অন্য কিছু নয় ;
২৫। " এটা তো মরণশীল মানুষের কথা।"
৫৭৯০। তফসীরকারদের মতানুসারে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় ওয়ালীদ বিন্ মুগাইরের আচরণ উপলক্ষে। ওয়ালিদ বিন মুগাইর ছিলো প্রাচীন ইটালীর নগরী সিবারিসের অধিবাসী বা সিবারাইট। তার মর্মস্থল পর্যন্ত ছিলো মোশরেকীতে পরিপূর্ণ। সে ছিলো এক আরব যার মোশরেকী ছিলো সংশোধনের অতীত। ফলে আল্লাহ্র রাসুলের জন্য সে ছিলো এক জঘন্য ব্যক্তি ও চিরশত্রু। সে এবং আবু জহল প্রথম থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে রাসুলকে (সা) সর্বপ্রকারে নির্যাতন করতে এবং ইসলামের প্রচারে বাঁধার সৃষ্টি করতে। রাসুল (সা) ও রাসুলের অনুসারী সাহাবাদের উপরে তারা যত প্রকার সম্ভব অত্যাচার ও নির্যাতন চালাতো। এরই পটভূমিতে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এই আয়াতের আবেদন ব্যপক ও বিশ্বজনীন। ওয়ালিদের ন্যায় ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বস্থানে সর্বকালে বিদ্যমান ছিলো, আছে এবং থাকবে। এরা ঐশ্বরিক বাণীর মর্ম অনুধাবনে অক্ষম সুতারাং ঐশ্বরিক বাণীর যে অলৌকিক প্রভাব সাধারণ মানুষের উপরে তা দর্শনে তারা হতভম্ব হয়ে পড়তো এবং তা ছিলো তাদের জন্য ব্যাখ্যার অতীত। সুতারাং তারা তা ব্যাখ্যা করতো যাদু হিসেবে। পরলোকের অনন্ত জীবন এবং সে জীবনের প্রত্যাশাকে তারা বিভ্রান্তি ব্যতীত অন্য কিছুই ধারণা করতো না।
২৬। শীঘ্রই আমি তাঁকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবো ৫৭৯১।
৫৭৯১। পাপীদের মানসিকতা বিকৃত। আর এই বিকৃত মানসিকতার সমাপ্তি ঘটবে দোযখের আগুনে যা তার অন্তরের অন্তঃস্থলকে দহন করতে সক্ষম হবে।
২৭। তুমি কি জাহান্নামের আগুনের ব্যাখ্যা জান ?
২৮। উহা তাদের তা সহ্য করার ক্ষমতাও দেবে না, আবার পরিত্যাগও করবে না। ৫৭৯২
২৯। মানুষের [গাত্রচর্মের ] রং পরিবর্তন করে কৃষ্ণবর্ণ করবে।
২৮। উহা তাদের তা সহ্য করার ক্ষমতাও দেবে না, আবার পরিত্যাগও করবে না। ৫৭৯২
২৯। মানুষের [গাত্রচর্মের ] রং পরিবর্তন করে কৃষ্ণবর্ণ করবে।
৫৭৯২। দোযখে পাপীদের অবস্থাকে এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। তা হবে জীবনামৃত অবস্থা। সে সম্পূর্ণ জীবিতও থাকবে না বা সম্পূর্ণ মৃত্যুও তার ঘটবে না। দেখুন [ ৮৭ :১৩ ]। এ এক ত্রিশঙ্কু অবস্থা। সৎকর্মশীলদের কর্মের ফলাফল পরলোকেও তাদের সম্মান ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করবে, অপরপক্ষে পাপীদের কর্ম তাদের ধ্বংস ঢেকে আনবে যা পরলোকে তার সর্ব সত্ত্বাকে গ্রাস করে ফেলবে। কারণ সে আল্লাহ্র প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে। জীবন মৃত্যুর মাঝামাঝি পাপীরা তাদের অনুভূতিতে সর্বসত্তাতে শাস্তির অনুভূতি, যন্ত্রনার তীব্রতাকে সুতীক্ষ্ণ ভাবে অনুভবে সক্ষম হবে যা হবে অনন্তকাল স্থায়ী এবং যার থেকে তার মুক্তিলাভ ঘটবে না - আল্লাহ্র অনুগ্রহ ব্যতীত।
৩০। উহার [ পাহারাদার ] আছে উনিশ জন। ৫৭৯৩
৫৭৯৩। এই ঊনিশজন প্রহরী কারা ? এই সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে ? ঊনিশ জন প্রহরী দ্বারা ঊনিশ জন ফেরেশতাকে বুঝানো হয়েছে, যাদের দোযখের প্রহরী নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি একটি প্রতীক ধর্মী বাক্য মানুষের গুণাবলীর যে মানসিক দক্ষতা তার সংখ্যা ঊনিশ। ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের গুণাবলীর যে মানসিক দক্ষতা সমূহ, তার সংখ্যা ঊনিশ আর এই মানসিক দক্ষতা সমূহকে উপযুক্তভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করা সম্ভব। কিন্তু যদি তার অপব্যবহার করা হয় তবে তার ধ্বংস অনিবার্য। মানসিক এই দক্ষতাসমূহ বা গুণাবলীই হচ্ছে ফেরেশতাদের প্রতীক যা আত্মাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে। আধ্যাত্মিক জগতে ফেরেশতারা হচ্ছে মানসিক ক্ষমতার প্রতীক স্বরূপ। এই ক্ষমতার প্রকৃত ব্যবহারই আত্মিক সফলতা বয়ে আনে এবং অপব্যবহার ধ্বংস ডেকে আনে।
৩১। এবং আমি ফেরেশতাগণকেই জাহান্নামের প্রহরী নিযুক্ত করেছি ৫৭৯৪। আমি তাদের সংখ্যাকে নির্দ্দিষ্ট করেছি ৫৭৯৫ অবিশ্বাসীদের পরীক্ষা স্বরূপ যেনো কিতাব প্রাপ্তদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে,বিশ্বাসীদের বিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং কিতাবীগণ ও বিশ্বাসীগণের যেনো মনে কোন সন্দেহ না থাকে। [ এর ফলে ] যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা এবং অবিশ্বাসীরা যেনো বলতে পারে, " এই প্রতীক দ্বারা আল্লাহ্ কি বুঝাতে চেয়েছেন " ? ৫৭৯৬ এ ভাবেই আল্লাহ্র যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন। তোমার প্রভুর বাহিনী সম্পর্কে তিনি ব্যতীত আর কেহ জানে না। ৫৭৯৭ এবং ইহা মানুষের জন্য সাবধানবাণী ব্যতীত অন্য কিছু নয়।
৫৭৯৪। দেখুন সূরা [ ৬৬ : ৬ ] ও টিকা ৫৫৪০।
৫৭৯৫। ঊনিশ সংখ্যাটির জটিল এবং তাত্বিক আলোচনাতে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আগ্রাহান্বিত দেখা যায়। কিন্তু মওলানা ইউসুফ আলী মনে করেন এ ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব না দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেমন খৃস্টানরা মনে করে শয়তানের সংখ্যা হচ্ছে ৬৬৬। আবার রোমানদের নিকট ১৮ হচেছ গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা ইত্যাদি। সুতারাং সংখ্যাতত্বের উপরে অধিক গুরুত্ব প্রদান না করাই উচিত কারণ তাতে অনুমানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহ্র বাণীর প্রকৃত মর্ম থাকে অনুদ্ঘাটিত।
৫৭৯৬। এই আয়াতটিতে চার শ্রেণীর লোকের উল্লেখ আছে।
১) মুসলিম, আল্লাহ্র আয়াতের বক্তব্য যাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তাকে আরও বৃদ্ধি করে থাকে। ফলে আল্লাহ্র করুণাধারা তাদের উপরে বর্ষিত হয়।
২) কিতাবী জাতিরা অর্থাৎ যারা পূর্বেই আল্লাহ্র কিতাব প্রাপ্ত হয়েছে। ইহুদী ও খৃষ্টানেরা আল্লাহ্র কিতাব প্রাপ্ত জাতি। এরা সময়ের পরিক্রমায় কিতাবের বহু অংশই ভুলে গেছে এবং সামান্য ও ক্ষুদ্র মতবাদের উপরে তারা বৃহৎ তর্কে লিপ্ত থাকে। কিন্তু যদি তাদের প্রকৃত ঈমান থাকে এক আল্লাহ্র উপরে তাহলে কোরাণের মাধ্যমে তাদের সকল বিবাদ বিসংবাদ দূর হয়ে যাবে ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে।
৩) যাদের অন্তরে ব্যধি [ ২ : ৮ - ১০ ] আয়াত ও টিকা ৩৩ - ৩৪ এরা হলো মোনাফেক বা মিথ্যাবাদী। ফলে তারা হয় অবিশ্বস্ত। মোনাফেকরা কোনও কিছুই বিশ্বাস করে না ফলে তারা শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র করুণা বঞ্চিত হয়।
৪) অবিশ্বাসী বা কাফের যাদের অবস্থা মোনাফেকদের অনুরূপ।
৫৭৯৭। আল্লাহ্ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। সে ইচ্ছা করলে ভালোকে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করতে পারে, বা মন্দকে গ্রহণ ও ভালোকে বর্জন করতে পারে। যদি আল্লাহ্ এই "ইচ্ছাশক্তি" না দিতেন তবে কেউই পথভ্রষ্ট হতো না এর পরেও যারা পথভ্রষ্ট তারা সৎপথে ফিরে আসতে চাইলে আল্লাহ্ তাদের পথ দেখান। মানুষের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ্র নিদর্শন ও সাবধান বাণী এবং তাঁর আধ্যাত্মিক জগত পরিচালনার বিশাল বাহিনীর সংবাদ জানেন একমাত্র আল্লাহ্ -যা তাঁর অসীম ক্ষমতার স্বাক্ষর। কোন মানুষের পক্ষেই সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সুতারাং জাহান্নামের এই বর্ণনা বিশ্বমানবের সকলের জন্য সাবধান বাণী।
সব কিছুই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন করবে আল্লাহ্র দিকে। মানুষের উচিত অনুধাবন করা যে আল্লাহ্ অসীম করুণার আঁধার। কোন ক্ষতি বা মন্দ আল্লাহ্র নিকট থেকে আসে না। সূরা [ ৪ : ৭৯] আয়াতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, যা কল্যাণকর ও মঙ্গলময় তা আল্লাহ্র নিকট থেকে আসে আর যা মন্দ তা আমাদের কৃতকর্মেরই ফল।
রুকু - ২
৩২। কখনই না, শপথ চন্দ্রের ৫৭৯৮
৫৭৯৮। আমাদের দৈনন্দিক জীবনে আমরা এমন কিছুর শপথ করি যা আমাদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র। আল্লাহ্র বাণীকে যখন মানুষের ভাষায়, মানুষের জন্য প্রেরণ করা হয়, তখন এমন কিছুর শপথ উচ্চারণ করা হয় যার পবিত্রতা মানুষের মনে প্রগাঢ় প্রভাব এবং গভীর রেখাপাত করবে। যা সরাসরি মানুষের হৃদয়ের দুয়ারে আঘাত হানবে। শপথের জন্য তাই-ই প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যার আবেদন নির্দ্দিষ্ট যুক্তিকে সমুজ্জ্বল করতে সাহায্য করবে। এই আয়াতে তিনটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপারের প্রতি চিন্তা করার জন্য আহ্বান করা হয়েছে, এবং শপথের বিষয়বস্তুকে দেয়া আছে ৩৮নং আয়াতে।
১) চন্দ্র হচ্ছে সূর্যের পরেই যার অবস্থান পৃথিবীকে আলোকিত করার ক্ষমতা। চাঁদের আলো আমাদের দৃষ্টিতে অতি মনোহর। চাঁদের আলোর বন্যা আমাদের করে বিমোহিত,মুগ্ধ, চাঁদের আলোর আলো আঁধারি বিশ্ব চরাচরে এক স্বপ্নের মায়াজাল বিস্তার করে যা সূর্যের অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যে আলো আমাদের নিকট স্বপ্নীল মনে হয়। চেনা পৃথিবীকে মনে হয় কোন স্বপ্নপুরীর রহস্যে ঘেরা। এ কারণে পৌত্তলিকদের অনেকেই চন্দ্রকে পূঁজনীয় হিসেবে গণ্য করতো। যদিও চাঁদের আলো পৃথিবীকে কোমলতায় ভরিয়ে দেয় - কোমল আলোর বন্যায় সমগ্র বিশ্বচরাচর ডুবে যায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে এই আলো চাঁদের কোনও নিজস্ব আলো নয়। এই আলো সে সূর্যের নিকট থেকে লাভ করে পৃথিবীতে প্রতিফলিত করে থাকে, যার ফলে চাঁদের আলোতে উষ্ণতা ও পৃথিবীর প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তি থাকে না, যা থাকে সূর্যের আলোতে। ঠিক সেরূপ অবস্থা হচ্ছে যারা আল্লাহ কে প্রত্যাখান করে আল্লাহ্র পরিবর্তে অন্য কোন শক্তির বা আল্লাহ্র সৃষ্ট বস্তুর উপাসনা করে আত্মার মুক্তির জন্য,বা আত্মার অন্ধকার দূর করার জন্য তাদের অবস্থা। এসব উপাস্য হচ্ছে চাঁদের মত, যাদের নিজস্ব ক্ষমতা নাই। কারণ সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্। যিনি সকল আধ্যাত্মিক আলোর উৎস।
২)নম্বর শপথ হচ্ছে রাত্রির এবং
৩) নম্বর শপথ হচ্ছে প্রভাতের।
এ জন্য দেখুন নিচের টিকা সমূহ।
৩৩। শপথ রাত্রির যখন তা অপসৃয়মান, ৫৭৯৯
৫৭৯৯। ২) নম্বর শপথ হচ্ছে রাত্রির। রাত্রি হচ্ছে অন্ধকারের প্রতীক। যদিও শুক্লপক্ষের রাত্রিগুলিতে চাঁদের আলো অন্ধকারকে কিছুটা প্রশমিত করতে সক্ষম, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে রাত্রি সর্বদা অন্ধকারকেই উপস্থাপন করে থাকে এবং
৩) প্রভাতের আগমনে তা অপসারিত হয়। সুতারাং রাত্রি হচ্ছে প্রভাতের আগমনের অগ্রদূত স্বরূপ। ঠিক সেরূপ হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগত। যখন প্রতিটি আত্মা তাঁর দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয় তাঁর অন্তরে বোধদয় ঘটে যে প্রকৃত আলোর উৎস কোথায়। সে তখন প্রতিফলিত আলোর দ্বারা প্রভাবিত বা প্রতারিত হবে না। আত্মার অন্ধকারকে অতিক্রম করে তার চেতনাতে প্রভাতের সূর্যের ন্যায় আল্লাহ্র হেদায়েতের আলোর প্রবেশ লাভ ঘটবে। প্রভাতের প্রথম আলো যেরূপ বিশ্ব প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলে, ঠিক সেরূপ আল্লাহ্র আলোতে উদ্ভাসিত করে জাগিয়ে তুলবে, আমাদের পৌঁছে দেবে স্বপ্নের দেশে বেহেশতে।
৩৪। শপথ ঊষা লগ্নের যখন তা আলোকজ্জ্বল হয়, -
৩৫। নিঃসন্দেহে [ জাহান্নাম হবে ] ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম, ৫৮০০
৩৫। নিঃসন্দেহে [ জাহান্নাম হবে ] ভয়াবহ বিপদ সমূহের অন্যতম, ৫৮০০
৫৮০০। এই আয়াতটির অনুবাদে বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে, " This is one of the mighty [ Portents ]." অর্থাৎ আল্লাহ্র শক্তিশালী পূর্ব লক্ষণসমূহের মধ্যে ইহা অন্যতম লক্ষণ। চাঁদের ক্ষয়িষ্ণু পান্ডুরতা, অপসৃয়মান রাত্রি, আলোকজ্জল সূর্যদয় এ সকলই নূতন দিনের আগমন বার্তার প্রতীক। আবার অনেক বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে, " এই জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদসমূহের অন্যতম।" অনেক তফসীরকারের মতে, "এই " শব্দটি জাহান্নামকে নির্দ্দেশ করে থাকে।
৩৬। মানুষের জন্য সতর্কবাণী, -
৩৭। তাদের জন্য যারা অগ্রসর হতে চায়, অথবা যারা পিছনে যেতে চায় ; ৫৮০১
৩৭। তাদের জন্য যারা অগ্রসর হতে চায়, অথবা যারা পিছনে যেতে চায় ; ৫৮০১
৫৮০১। এই আয়াতটির জন্য তিন প্রকারের ব্যাখ্যা প্রযোজ্য হতে পারে।
১) 'অগ্রসর হতে চায়' দ্বারা বুঝানো হয়েছে তাদেরই যারা পূণ্যাত্মা মোমেন ব্যক্তি, যারা আল্লাহ্র রাস্তায় অগ্রবর্তী পথিক। 'পিছনে যেতে চায়' দ্বারা বুঝানো হয়েছে তাদেরই যারা অগ্রবর্তীদের পশ্চাতে আগমনকারী ব্যক্তি, যারা অবিশ্বাসী এবং যারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ, দয়া, এবং সদয় তত্বাবধানকে প্রত্যাখান করে।
২) দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে : এই আয়াত দ্বারা দুধরণের মনের গঠনগত প্রকৃতির বর্ণনা করা হয়েছে। একশ্রেণীর হচ্ছেন তারাই যারা আল্লাহ্র পথে সর্বদা অগ্রদূতের ভূমিকা গ্রহণে আগ্রহী, অন্য শ্রেণী সর্বদা পিছনে থাকতে আগ্রহী। আল্লাহ্র বাণী এই দুই শ্রেণীর জন্যই সমভাবে উম্মুক্ত থাকে। কিন্তু দুই শ্রেণীর জন্যই, তা সমভাবে বিপদজনক। প্রথম শ্রেণীর জন্য বিপদজনক হচ্ছে তাদের অত্যাধিক আত্মবিশ্বাস যা তাদের ভুল পথে চালিত করতে পারে; অর্থাৎ Religious arrogance. দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য বিপদ হচ্ছে তারা তাদের আধ্যাত্মিক জগতের উন্নতির সুযোগ গ্রহণ করতে পারে না।
৩) তৃতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছেঃ এই সতর্ক বাণী তাদের জন্যই প্রযোজ্য হবে, যারা সম্মুখে ও পশ্চাতে যখন যেরূপ প্রয়োজন যাতায়াতে ইচ্ছুক, কিন্তু তাদের অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তার জন্য তারা তা পারে না। আমাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতির জন্য স্থবিরতার স্থান নাই, প্রয়োজনে সম্মুখে অগ্রসর হতে হবে আবার কখনও কখনও মিথ্যার কৃষ্ণজাল থেকে পিছিয়ে আসতে হবে। চলমান জীবন প্রবাহের ন্যায় আধ্যাত্মিক জীবন প্রবাহ হবে চলমান। অপরপক্ষে,সর্বাপেক্ষা আশাহীন হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার আধ্যাত্মিক জীবন মৃত। অর্থাৎ সে ন্যায় অন্যায়, সত্য -মিথ্যা, ভালো -মন্দ, ও পাপ পূণ্যের পার্থক্য করতে সক্ষম নয়। ফলে সে ভালোর প্রতি অগ্রসর হওয়া ও পাপ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে না।
৩৮। প্রতিটি আত্মাকে তার নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ করা হবে। ৫৮০২
৫৮০২। দেখুন [ ৫২ : ২১ ] আয়াত। আল্লাহ্র দুনিয়ার নিয়ম হচ্ছে কেহ কারও পাপের বোঝা বহন করবে না। প্রত্যেককে প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্যের জন্য দায়ী করা হবে। কোনও সাধু বা পীর বা যাজক সম্প্রদায় কারও পাপ থেকে মুক্তি দিতে অক্ষম। যেমন দেখা যায় হিন্দুদের মাঝে পুরোহিত শ্রেণী, খৃষ্টানদের মধ্যে যাজক শ্রেণী ইত্যাদি যারা নিজেদের পাপীদের পাপ মুক্তির ধারক ও বাহকরূপে নিয়োজিত মনে করে। কিন্তু ইসলামে এরূপ মধ্যবর্তী কোনও শ্রেণী নাই। ইসলামে বান্দার সম্পর্ক সরাসরি আল্লাহ্র সাথে। বান্দার আত্মিক মুক্তি সরাসরি আল্লাহ্র করুণা ও ক্ষমার উপরে নির্ভরশীল। সুতারাং আল্লাহ্র করুণা ও ক্ষমা লাভের জন্য বান্দা সর্বদা সর্বান্তঃকরণে চেষ্টা করে যাবে সৎ ও ন্যায়ের রাস্তায়। যদি সে তা করতে পারে তবে তাঁর আত্মিক মুক্তি ঘটবে এবং পূণ্যাত্মা বা দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিগণের অর্ন্তভূক্ত হবে।
৩৯। দক্ষিণ পার্শ্বের লোকেরা ব্যতীত ৫৮০৩
৫৮০৩। দেখুন [৫৬ : ৩ ] আয়াতের টিকা ৫২২৩ এবং সূরা [ ৫৬ : ২৭ -৩৮ ] আয়াত। দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা হচেছন আল্লাহ্র আর্শীবাদ প্রাপ্ত ব্যক্তি, যারা পরকালে আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভে ধন্য হবেন। তাঁদের এই বিশেষ আনুকুল্য লাভের কারণ তারা আন্তরিকভাবে আল্লাহ্র অনুগ্রহ প্রার্থনা করতেন, ২) আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য দান করতেন এবং ৩) সর্বদা আল্লাহ্র ন্যায় বিচারে বিশ্বাসী ছিলেন। এগুলি অর্জন করা খুব কঠিন কিছু নয় যে আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভ করতে চায় সেই-ই এ সব অর্জন করতে সক্ষম। এই গুণগুলি কোনটাই স্বতন্ত্র নয় বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত নয়, এগুলি হচ্ছে পরস্পর সর্ম্পক যুক্ত একক গুণ বিশেষ। শেষ বিচারের দিনে পৃথিবীতে কৃতকর্মের হিসাব দাখিলের মাধ্যমে আল্লাহ্র করুণার দ্বারা পূণ্যাত্মাদের আত্মিক মুক্তি ঘটবে।
৪০। তারা থাকবে [ আনন্দের ] উদ্যানে। তারা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করবে,
৪১। পাপীদের সম্বন্ধে ;
৪২। " কি কারণে তোমরা জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছ ?
৪৩। তারা বলবে, " আমরা নামাজ পড়তাম না ;
৪৪। " আমরা অভাবগ্রস্থকে আহার্য্য দান করতাম না ;
৪৫। " আমরা দাম্ভিকদের সাথে অহংকারের কথা বলতাম ;
৪৬। " আমরা শেষ বিচার দিবসকে অস্বীকার করতাম,
৪৭। " যতক্ষণ না সেই নিশ্চিত [ ক্ষণ ] এসে উপস্থিত হলো।" ৫৮০৪
৪১। পাপীদের সম্বন্ধে ;
৪২। " কি কারণে তোমরা জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছ ?
৪৩। তারা বলবে, " আমরা নামাজ পড়তাম না ;
৪৪। " আমরা অভাবগ্রস্থকে আহার্য্য দান করতাম না ;
৪৫। " আমরা দাম্ভিকদের সাথে অহংকারের কথা বলতাম ;
৪৬। " আমরা শেষ বিচার দিবসকে অস্বীকার করতাম,
৪৭। " যতক্ষণ না সেই নিশ্চিত [ ক্ষণ ] এসে উপস্থিত হলো।" ৫৮০৪
৫৮০৪। নিশ্চিত ক্ষণ অর্থাৎ মৃত্যুর সময়। এই আয়াতটি দ্বারা এক বিরাট ভাবের প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। পৃথিবীতে সাধারণ মানুষের মনঃস্তাত্বিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অগ্রসরমান আধ্যাত্মিক জগতের এটি একটি চিত্র। আত্মার অস্তিত্ব এবং স্রষ্টার একত্বে বিশ্বাসই হচেছ ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। যদি কারও এই বিশ্বাসই না থাকে,তবে সত্যের আলো সে হৃদয়ে প্রবেশের অধিকার লাভ করে না। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বারে বারে সত্যের বাণী তাদের দুয়ারে করাঘাত করেছে,সত্যের আলো প্রবেশের জন্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারেই তা নির্বাপিত করা হয়েছে। কিন্তু তখনই তারা সত্যের পদধ্বনিকে সনাক্ত করতে পারবে যখন মৃত্যু তাদের দুয়ারে হানা দিবে। পৃথিবীর মানুষ অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি লাভের আশায় এতটাই মত্ত থাকে যে, প্রকৃত সত্যকে অনুভব করা বা সত্যের আহ্বান উপলব্ধি করতেও অক্ষম হয়। কিন্তু মৃত্যু পরপারের জীবনে যখন তারা তা পারবে,তখন আর অনুতাপের মাধ্যমে আত্ম সংশোধনের সময় থাকবে না।
৪৮। তখন [ কোন ] সুপারিশকারীর সুপারিশে কোন লাভ হবে না।
৪৯। তাদের কি হয়েছে যে, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় সর্তকবাণী থেকে ? ৫৮০৫
৪৯। তাদের কি হয়েছে যে, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় সর্তকবাণী থেকে ? ৫৮০৫
৫৮০৫। মানুষ পৃথিবীর সকল প্রাণী থেকে আলাদা এই কারণে যে, একমাত্র মানুষই ইহকালকে অতিক্রম করে মরণের সিংহদ্বার পেরিয়ে পরলোকের অনন্ত জীবনে প্রবেশ লাভ করবে। পরলোকের জীবনের সুখ-শান্তি, বা বিপদ বিপর্যয় নির্ভর করবে শেষ বিচারের দিনের ফলাফলের উপরে। শেষ বিচারের দিন অবশ্যম্ভাবী। সুতারাং এটা কি অদ্ভুদ নয় যে, মানুষ এই অবশ্যম্ভাবী সত্য সম্বন্ধে সচেতন হয় না? সতর্কবাণী গ্রহণ করে না ? নির্বোধ গর্দ্দভ যেরূপ সিংহের ভয়ে ভীত স্ত্রত হয়ে পলায়ণপর হয়ে থাকে, এসব অমনোযোগী, উদাসীন লোকেরাও ঠিক সেরূপ আল্লাহ্র সতর্কবাণীকে পরিহার করে চলে।
৫০। যেনো তারা ভীত-স্ত্রত গর্দ্দভ,
৫১। যে সিংহ থেকে পলায়নপর।
৫২। নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি গুটানো [ প্রত্যাদেশ ] উন্মুক্ত করে দেয়া হোক। ৫৮০৬
৫১। যে সিংহ থেকে পলায়নপর।
৫২। নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি গুটানো [ প্রত্যাদেশ ] উন্মুক্ত করে দেয়া হোক। ৫৮০৬
৫৮০৬। দেখুন [ ১৭ : ৯৩ ] আয়াত যেখানে বলা হয়েছে, " ........ যে পর্যন্ত না আপনি অবতীর্ণ করেন আমাদের প্রতি এক গ্রন্থ, যা আমরা পাঠ করবো।" যারা অবিশ্বাসী তাদের মনঃস্তত্বকে এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। তারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে হাস্যস্পদ করার মানসে এক অবাস্তব অদ্ভুত প্রস্তাবের উপস্থাপন করে থাকে। তারা বলে যে, তাদের প্রত্যেকের জন্য বিশেষ ভাবে লেখা আলাদা কিতাব প্রেরণ করা হোক অলৌকিক ভাবে তাদের এই চাওয়া তাদের অবিশ্বাসী হৃদয়েরই প্রতিফলন। কারণ বিশ্ব নবীর নিকট প্রেরিত সতর্কবাণীর ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল যে কেউ আল্লাহ্র রহমত অনুসন্ধান করে তার জন্য আল্লাহ্র কুর-আনই যথেষ্ট।
৫৩। না কখনও না। তারা তো পরলোকের ভয় পোষণ করে না।
৫৪। নিশ্চয়ই, ইহা [ কুর-আন ] হচ্ছে এক সতর্কবাণী ;
৫৫। তাদের জন্য যারা তা স্মরণ রাখতে চায়। ৫৮০৭
৫৪। নিশ্চয়ই, ইহা [ কুর-আন ] হচ্ছে এক সতর্কবাণী ;
৫৫। তাদের জন্য যারা তা স্মরণ রাখতে চায়। ৫৮০৭
৫৮০৭। আল্লাহ্র প্রেরিত কিতাব সমূহের মধ্যে কোরান হচ্ছে সর্বশেষ গ্রন্থ যা মানুষের জন্য সতর্কবাণী স্বরূপ। যদি কেউ সেই বাণীকে অন্তরে ধারণ করতে চায়, তবে সে সর্বদা আল্লাহ্র বাণী তাঁর সম্মুখে রাখবে। ফলে আল্লাহ্র অনুগ্রহ তার সর্বসত্ত্বাকে পরিবর্তিত করতে সাহায্য করবে।
৫৬। আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত কেহ তা স্মরণ করবে না। তিনিই পূণ্যাত্মাদের প্রভু, ও ক্ষমা করার অধিকারী ৫৮০৮।
৫৮০৮। "Taqwa" শব্দটির জন্য দেখুন সূরা [ ২ : ২ ] এবং টিকা ২৬।
৬৪৫০ বার পড়া হয়েছে
৫৬ টি আয়াত
মক্কী সূরা